Header Ads Widget

Responsive Advertisement

কওমি মাদরাসার ছেলেরা



বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কওমি মাদরাসার ছেলেরা পৃথিবীর গঠন ও বিন্যাস, পাহাড় পর্বত, নদী নালা, খালবিল, সমূদ্র প্রণালী, কোনটার কী রাজনৈতিক গুরুত্ব ও প্রভাব এসব জানে না। 


খনিজ পদার্থ, রেয়ার পদার্থ, এগুলো রাজনীতিতে কীভাবে প্রবল ভূমিকা রাখে, কোন দেশ কীসের জন্য পাগল, এসব নিয়া কোন দেশ পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে আর কারা চিপায় আছে এগুলো সম্পর্কে কোনো খবর নাই। 


সুপার পাওয়ারগুলো বাংলাদেশ বা অন্য ছোট দেশগুলোতে কোন ভূরাজনৈতিক স্বার্থে আসতে চায়, কার কী এজেন্ডা, বিশ্ব রাজনীতি কীভাবে ফাংশন করে, এ নিয়াও কোনে জানাশোনা নাই। 


দেশের প্রাসাশনিক কাঠামো, বিচার বিভাগ, বিভিন দরকারী অফিস ও তার কর্মপরিধি, তার নাগরিক অধিকার কী, দেশে তার ভূমিকা কী, এগুলো নিয়া মাথাব্যথা নাই। 


জানে না টাইমজোন, দ্রাঘিমা, অক্ষ, ডিগ্রি, তারিখরেখা।


বাংলাদেশ ও ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস জানার জন্য ধারাবাহিক কোনো প্রচেষ্টা নাই, সুন্দর একটা বই নাই। জানে না সাম্রাজ্যবাদিতার ইতিহাস। 


লিবারালিজম, সেক্যুলারিজম, কমিউনিজম, ন্যাশনালিজমসহ জানা আবশ্যক এমন অনেক মতবাদ সম্পর্কে স্পষ্ট, গভীর ও একাডেমিক ধারণা নাই। 


ইংরেজি ভাষাটা পর্যন্ত ভালোভাবে শেখানোর ব্যবস্থা নাই। অথচ, এটা ছাড়া এখন একজন শিক্ষিত মানুষ চলবে কীভাবে? 


বেখবর বিজ্ঞানের বেসিক সম্পর্কেও৷ আইটি বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞানের আয়োজনটাও নাই। এমনকি বেশিরভাগই এমন, যারা গুগলের দরকারী ফিচারগুলো ব্যবহার করতে জানে না৷ 


এসব স্রেফ উদাহরণমাত্র। এমন দরকারী বহু বিষয় আছে, যেগুলো আলেম হিসেবে জানা থাকা দরকার৷ 


জিজ্ঞেস করলে বলা হয়, এগুলো জেনারেল বিষয়। এসবের জন্য দেশে লোক আছে। এসব জানা আমাদের কাজ না। আমাদের কাজ হলো কুরআন হাদীস। 


ভাবটা এমন থাকে, কওমি শিক্ষা ও জেনারেল শিক্ষা সুন্দর ও হৃদ্যতাপূর্ণ একটা সমঝোতায় আছে। যে যার কাজ করবে এবং প্রত্যেকে তার জ্ঞানের অভাবটুকু পূরণ করে দিবে। 


অথচ, বাস্তবে সম্পূর্ণ উল্টা। ক্ষমতাশীল জেনারেল সমাজ তাদেরকে ট্রিট করে ভিন্ন জাতি হিসেবে। সবসময় কর্নার্ড করে রাখে। উন মানুষ বানিয়ে রাখে। 


ফলে, কওমির লোকজন রাজনীতিতেও যেতে হয়। সাহিত্য সাংবাদিকতায়ও যেতে হয়। ব্যবসা বা চাকরিতেও চেষ্টা করতে হয়। জাতীয় ইস্যু নিয়াও ভূমিকা রাখতে হয়। নিজের নাগরিক অধিকারের জন্য ফাইটও দিতে হয়। 


এর ফলাফল হয় এই যে, প্রস্তুতি ছাড়া এবং জানাশোনা ও যোগ্যতা ছাড়াই এসব কাজ করতে হয়। যার কারণে, কিছুই ভালোভাবে করা সম্ভব হয় না। 


রাজনীতি করে ঠিকই, কিন্তু দেশের আইন, শিল্প ও অর্থনীতি, প্রাশাসনিক কাঠামো, বৈদেশিক সম্পর্ক, তেল গ্যাস, বাজেট ইত্যাদি নিয়া কোনো পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনা নাই। কোনো বয়ান নাই। বিপুল পরিমাণ তৌহিদী জনতা ও সাধারণ জনতা তাদেরকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে, কিন্তু ভোট দেয় না। কারণ, তারা তাদেরকে যোগ্য মনে করে না। 


শুধু ধর্মীয় কিছু ইস্যু নিয়াই তাদের সবটুকু রাজনীতি দাঁড়ায়।  


কওমির অনেক ছেলে আছে, নিজের ব্যক্তিগত পড়াশোনা, আগ্রহ ও পরিশ্রম দিয়ে এসব বিষয়ে পারদর্শী হয়; কিন্তু এর পরিমাণ খুবই অল্প। 


এই সংকট কাটাতে হলে বিষয়গুলো শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির বিকল্প নাই। আমি সমন্বিত সিলেবাস, মাদরাসাকে আধা স্কুল বানানো এসবের কথা বলছি না৷ এটুকু জ্ঞান তৈরী করতে এসব করা লাগে না। একটু মনোযোগ, একটু চর্চা, সুন্দর ও সমৃদ্ধ দুটো বই--শিক্ষা কারিকুলামে ঢুকিয়ে দিলেই হয়। 


.

দীন দুনিয়া সম্পর্কে এমন বেখবর থাকার কারণে রাষ্ট্রিয় পরিসরে প্রভাব তৈরী করতে পারে না, ধর্মীয় ইস্যুর বাইরে জনমত তৈরী করতে পারে না, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে অসংলগ্ন আচরণ করে এবং খুব দ্রুত অদ্ভুত সব ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দ্বারা আক্রান্ত ও উত্তেজিত হয়।  


.

সেই সাথে দীনের গভীর জ্ঞান না রাখা জেনারেল মেধাবী কিছু মানুষ এসব বিষয়ে বিশ্লেষণের চমক দেখিয়ে, পশ্চিমের সুন্দর ক্রিটিক করে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভিতর উদোম করে দেখিয়ে কিংবা জাতীয় বিষয়ে সুন্দর আলোচনা করে কওমির তরুণ প্রজন্মকে নাকে দড়ি লাগিয়ে ঘুরায়। ইচ্ছামতো বয়ান গিলায়। মুগ্ধতায় অন্ধ বানিয়ে রাখতে পারে। 


কিন্তু দীনের পরিপক্ক সমঝ না থাকার কারণে সেই মানুষগুলো নিজেদের মন মতো ছেলেদেরকে কীভাবে কোন ভুল প্রান্তরে নিয়ে উপনীত করে, সে খেয়ালটুকুও করতে পারে না।


অথচ উচিত ছিল প্রত্যেককে উপযুক্ত মূল্যায়ন করে যে যে বিষয়ে পারদর্শী, তাকে সে বিষয়ে গ্রহণ করা, সমর্থন করা, বাহ্বা জানানো এবং সুন্দর সমন্বয়ের মাধ্যমে তাৎপর্যপূর্ণ একটি সহযাত্রা নিশ্চিত করা৷ 


কিন্তু কীসের কি! সব চলছে আওলা ঝাওলা।


উপযুক্ত খোরাক না দিয়ে খালি পুলাপান জামাতি হয়ে যাচ্ছে, মানহাজি হয়ে যাচ্ছে, এসব বলে কোনো লাভ হবে না৷ মানুষকে যোগ্য ও স্বনির্ভর বানিয়ে দিলে সে তখন অন্ধের মতো অন্যের পিছে ঘুরবে না। নিজেই পথ দেখাবে।


.

নত মস্তকে স্বীকার করি, এ দেশে কওমি মাদরাসার অবদান আকাশসম। এখনও সে তার বিশাল অবদান রেখে যাচ্ছে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে। 


আমি ব্যক্তিগতভাবে এটাও মনে করি, কওমি মাদরাসাকে জগতের সব দায়িত্ব নিতে হবে না বা নেওয়া উচিত না। খালেস দীনি ইলম নিয়াই থাকবে। উম্মতের মধ্যে একটা অংশ এমন নিখাঁদ আলেমই থাকতে হবে। কুরআনে বর্ণিত সেই "ত্বায়েফা"।  


কিন্তু তবু, একজন যুগ সচেতন আলম হিসেবে তার প্রয়োজনীয় যে " জেনারেল নলেজ", যেটা ছাড়া সে সমাজে নেতৃত্ব দিতে পারবে না, সেই নলেজটুকুর কথা বলছি শুধু। 


সেই সাথে দেশে যুগ যুগ ধরে যে সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় সংকট ও বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে, তার মোকাবেলায় আমরা যেন রয়োজনীয় জেনারেল ভূমিকা রাখতে গিয়ে ইফেক্টিভ হতে পারি, সেই আবেদনটুকু করছি শুধু।

লিখেছেনঃ Saber Chowdhury


Post a Comment

0 Comments